রেজি তথ্য

আজ: সোমবার, ২২শে জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ ৭ই শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ ১৬ই মহর্‌রম, ১৪৪৬ হিজরি

রাঙ্গুনিয়ায় এক গৃহবধূর মৃত্যু নিয়ে রহস্য

আশিক এলাহী, রাঙ্গুনিয়া :

রাঙ্গুনিয়া উপজেলার পোমরা ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম নবাবী পাড়া এলাকার ফারহানা আকতার বকুল (২৬) নামের এক গৃহবধূর মৃত্যু নিয়ে এলাকায় নানা গুঞ্জন চলছে।

গত বুধবার (২৩ মার্চ) সকালে নিজ শ্বশুর বাড়িতে মারা যায় সে। গৃহবধূর শ্বশুরপক্ষ প্রথমে আত্মহত্যা বলে প্রচার করলেও এখন আত্মহত্যা ও হত্যাকান্ড এরকম কিছু নয় বলে জানান। কিন্তু মৃত বকুলের বাবা আবুল বশর বলেন, এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকান্ড। তিনি বলেন, মিথ্যা অপবাদ দিয়ে আমার মেয়েকে দীর্ঘদিন ধরে অত্যাচার চালিয়ে আসছে তার স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন। এ নিয়ে বৈঠক করেও তার সংসারে সুখ এনে দিতে পারলাম না। আমার মেয়েকে ওরা মেরেই ফেলল। এদিকে শ্বশুরপক্ষের লোকজন মৃত্যুর বিষয়ে এলোমেলো তথ্য দেওয়ায় এলাকাবাসীর অনেকে ক্ষুব্ধ এবং এই ঘটনাকে রহস্যজনক বলে মন্তব্য করেছেন।

এলাকাবাসী জানান, বকুলের স্বামী মো, ইসমাঈল আরব আমিরাত প্রবাসী। সে আগেও দুইটি বিয়ে করেছে। বকুল ছিল তাঁর তৃতীয়তম স্ত্রী। তাদের পরিবারে যমজ দুইটি ৫ বছর বয়সী পুত্র সন্তান রয়েছে। শ্বশুরবাড়ির লোকজনের সাথে কথা হলে তারা কথার শুরুর দিকে বকুলের প্রশংসা করে এবং শ্বশুরবাড়ির কারো সাথে তার কোন ঝামেলা ও বিরোধ ছিল না বলে জানান। কিন্তু কথার শেষের দিকে তারা উল্টা বলেন, সে অবৈধভাবে অন্য একটি ছেলের সাথে ফোনে কথা বলত। এবং এসবের রেকর্ড বা মেসেজ প্রমাণ আছে। কিন্তু প্রমাণ চাইলে প্রমাণ দিতে পারেনি শ্বশুরপক্ষের লোকজন। বকুলের পরিবার ও স্থানীয়রা বলেন, সত্য ঘটনা আড়াল করতে মিথ্যা বানোয়াট কথা বলছেন। উপজেলা স্থাস্থ্যকেন্দ্রে নেওয়ার পর বকুলের মৃত্যু হয়েছে বলে জানান তারা শ্বশুরবাড়ির লোকজন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের গত বুধবার (২৩ মার্চ) কর্তব্যরত চিকিৎসক সামিউল করিম চৌধুরী বলেন, বুধবার সকাল সাড়ে ৭ টার দিকে বকুলের ননদ সাজু আকতার, ননদের জামাই ছৈয়দুল আলম ও আরেকজন মহিলাসহ বকুলকে হাসপাতালে নিয়ে এসে বলে বকুল বমি করছিলো কিন্তু আমরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখি বকুল মৃত। তার মৃত্যুর কথা শুনে বকুলের ননদ সাজু আকতার উল্টা বলেন সে বমি করেনি এমনি মাথা ঘুরে পড়ে গেছে আমাদের লাশ দিয়ে দেন। তাদের উল্টাপাল্টা কথা শুনে আমার সন্দেহ হওয়ায় তখন আমি থানায় বিষয়টি জানাই এবং ময়নাতদন্ত করার ব্যবস্থা নিতে বলি। কিন্তু বকুলের সাথে তার ননদসহ যারাই আসছিলো সবাই ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ নিতে চেয়েছিলো। পরে ৯ টার দিকে পুলিশ এসে লাশ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠিয়ে দেয়।

ইসমাঈলের মা আয়শা খাতুন বলেন, বুধবার (২৩ মার্চ) সকালে ফজরের নামাজ পড়ে দেখি বউ নিজ রুমের বাথরুমের দরজার পাশে বেহুশ অবস্থায় পড়ে ছিল। ওই সময় তার মুখে ফেনা ছিল। পুত্র সন্তান দুইজন তার মায়ের পাশে বসা ছিল। তার স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে বলে তিনি ধারণা করে বলেন বউ আত্মহত্যা করলে বিষের গন্ধ বা শরীরে দাগ থাকত কিন্তু এইগুলো তো কিছু নেই। কথা শেষ না হতে শ্বশুরপক্ষ থেকে ইসমাঈলের ভাবী খতিজা বেগম বলে উঠলেন বউ যখন বেহুশ অবস্থায় পড়েছিল তখন সে পায়খানা ও প্রসাব করেছিল এবং তার শরীরে পায়খানা ও প্রসাবের গন্ধ ছিল। আগের বউয়ের প্রসঙ্গে আয়শা খাতুন বলেন, প্রথম বউ কান কাটা ছিল তাই সংসারে আনা হয়নি। দ্বিতীয় বউ বাপের বাড়িতে চলে যাওয়ার পর আর আসেনি। এদিকে ইসমাঈলের ২য় স্ত্রীর বাবা মরিয়ম নগর এলাকার জহির আহম্মদের কাছে জানতে চাইলে বলেন, “আমার মেয়ের কোন দোষ ছিলোনা কিন্তু ইসমাঈল ও তার পরিবারের নির্যাতনের কারণে আমার মেয়ে সেখানে থাকতে পারেনি। তাঁরা খুব খারাপ প্রকৃতির মানুষ”।

পোমরা লতিফিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষিকা রহিমা, শিল্পী, রুবিসহ অন্তত ৬ জন শিক্ষক ও শিক্ষিকার সাথে কথা হয়েছে, তারা জানান, বকুলও আমাদের স্কুলের ছাত্রী ছিল। সে খুব ভাল, শান্ত ও অমায়িক মেয়ে ছিল। বকুলের মৃত্যুর কিছুদিন আগে স্কুল থেকে তার ছেলের উপবৃত্তির জন্য তার ভাবী ও ননদের সাথে যোগাযোগ করা হলে বকুলের ডকুমেন্টস আনতে বলা হয়েছিলো। বকুলের ননদ ও পরিবারের বড় বউ স্কুলে আসছিলো, মায়ের পরিবর্তে ফুফির ডকুমেন্টস দেওয়া যাবে কিনা জিজ্ঞাসা করেছিল ননদ। কিন্তু আমরা বলেছিলাম মায়ের ডকুমেন্টস ছাড়া অন্য কারোর ডকুমেন্টস হবে না। কথার প্রসঙ্গে তার ননদ সাজু আকতার স্কুল ম্যাডামদের বলেছেন পারিবারিক কারণে বকুলকে তালাক দেয়া হবে। তাই তার নামে করতে চাচ্ছি না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বকুলের ননদ সাজু আকতার, ইসমাঈলের বড় ভাবী খতিজা বেগম ও শ্বাশুরি আয়শা খাতুনের কাছে জানতে চাইলে তাঁরা এসব কথায় সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, এসব বকুলের জামাই ইসমাঈলের সিদ্ধান্ত।
বকুলের ননদ সাজু আকতার বলেন, “আমার ভাই ইসমাঈল বকুলকে ডিভোর্স দিবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তাই বলেছি। অথচ এরপর দিনই নিজ শ্বশুর বাড়িতে মারা যান বকুল।

এলাকার স্থানীয় ইসলাম খাতুন বলেন, মঙ্গলবার (২২ মার্চ) মৃত্যুর আগেরদিন সন্ধ্যা ৭ টায় বিয়ের দাওয়াত দিতে যায় তার শ্বশুরবাড়িতে। শ্বাশুরিকে দাওয়াত দিয়ে বলি বকুলকে সাথে নিয়ে বিয়েতে যেতে কিন্তু তখন উত্তরে শ্বাশুরি বললেন তাকে নিয়ে যাব না। তাকে ঘরে তালা মেরে যাব। তিনি বলেন, তখন এসময়ে শ্বশুর বাড়িতে সবার সাথে দেখা হলেও বকুলকে দেখতে পায়নি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তার শ্বাশুরি বলেন, সে আমার দেবরের বউ তাই মশকারা করেছি।

এদিকে এলাকার স্থানীয়রা যারা বকুলের দাফনকাজ করেছে তারা বলেন, “এম্বুলেন্স থেকে বকুলের নামানো থেকে শুরু করে গোসল ও দাফনকাজে বকুলের শ্বশুরবাড়ির কোনো লোক এগিয়ে আসেনি। তারা খুব দূরে-দূরে ছিলো। তাছাড়াও বকুলের ননদ সাজু আকতার তার জামাই নিয়ে ২ মাস সে বাসায় ছিলো কিন্তু বকুলের মৃত্যুর দিন থেকে তারা সে বাসা ছেড়ে চলে গেছে।এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সাজু আকতার বলেন বাবার অসুস্থতার জন্য ছিলাম।

সাজু আকতারের জামাই ছৈয়দুল আলম কারণে অকারণে বকুলকে শাসাতেন এলাকাবাসীর এমন অভিযোগের প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ছৈয়দুল আলম বলেন, “এটা মিথ্যা কথা”

স্থানীয় ইউপি সদস্য আলমগীর তালুকদার রনি বলেন, “বকুলের মৃত্যুর বিষয়টি জানতে পেরে থানায় যাই। বকুল খুব ভাল মেয়ে। গত কিছুদিন আগে তার শ্বশুর বাড়িতে বকুল ও ইসমাঈলের বিষয়ে বৈঠক হয়। বৈঠকে বকুলের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ করা হয়েছে সে বৈঠকে বকুলকে সামনে না আনায় সেসবের সত্যতা পাইনি। বকুলের শ্বশুর পক্ষের লোকজন বকুলের মা-বাবাকে স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করতে বলে। যেটা সমীচীন নয়। তাই আমি বৈঠক ফেলে চলে আসি। এছাড়া বকুলের শ্বশুরসহ আমি নিজেও জানাযায় ছিলাম। তবে ননদের জামাইকে জানাযায় দেখেনি। বকুলের মৃত্যু যদি হত্যাকাণ্ড হয়ে থাকে তাহলে এর সুষ্ঠু বিচার না হওয়া পর্যন্ত আমি এলাকাবাসীকে সাথে নিয়ে মানববন্ধন করে যাবো”।

রাঙ্গুনিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মাহবুব মিলকী জানান, এবিষয়ে একটি অপমৃত্যু মামলা হয়েছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পেলে হত্যা নাকি আত্মহত্যা জানা যাবে।।

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on pinterest
Pinterest
Share on reddit
Reddit

Discussion about this post

এই সম্পর্কীত আরও সংবাদ পড়ুন

আজকের সর্বশেষ

ফেসবুকে আমরা

সংবাদ আর্কাইভ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০৩১