রেজি তথ্য

আজ: বৃহস্পতিবার, ১৮ই এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ ৫ই বৈশাখ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ ৯ই শাওয়াল, ১৪৪৫ হিজরি

চট্টগ্রামের ঐতিহিসিক প্রাচীন মসজিদ

মাওলানা মুহাম্মদ রাহাত উল্লাহ:

পর্ব (১)
মসজিদ আল্লাহর ঘর। মুসলিম মিল্লাত প্রাণভরে যেখানে আল্লাহর আহবানে সাড়া দিয়ে সালাত প্রতিষ্ঠা করেন। সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। চট্টগ্রামের ঐতিহিসিক প্রাচীন মসজিদ নির্মাণের পিছনে রয়েছে স্থাপত্য ঐতিহিসিক নিদর্শনাবলী। নিম্মে চট্টগ্রামের স্থাপত্যশৈলীর কিছু মসজিদের তালিকা ধারাবাহিক পেশ করা হল।
১. বজরা শাহী মসজিদ
(১৭৪১ সালে অর্থাৎ প্রায় পৌনে তিনশ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত)
মোগল সম্রাট মুহাম্মদ শাহের আমলে দিল্লির বিখ্যাত জামে মসজিদের অনুকরণে জমিদার আমান উল্যাহ ১১৫৪ হিজরি সাল, ১১৩৯ বাংলা মোতাবেক ১৭৪১ সালে অর্থাৎ প্রায় পৌনে তিনশ বছর আগে চট্টগ্রাম বিভাগের সোনাইমুড়ী উপজেলার বজরা নামক এলাকায় বজরা শাহী মসজিদ নির্মাণ করেন। জমিদার আমান উল্যাহ নিজের বাড়ির সামনে প্রায় ৩০ একর জমির ওপর উঁচু পাড়যুক্ত একটি বিশাল একটি দিঘি খনন করেন। সেই দিঘির পশ্চিম পাড়ে মনোরম পরিবেশে আকর্ষণীয় তোরণ বিশিষ্ট ১১৬ ফুট দৈর্ঘ্য, ৭৪ ফুট প্রস্থ এবং প্রায় ২০ ফুট উঁচু ৩টি গম্বুজ বিশিষ্ট ঐতিহাসিক বজরা শাহী মসজিদ নির্মাণ করেন। মসজিদকে মজবুত করার জন্য মাটি থেকে প্রায় ২০ ফুট গভীরে পিলার গাঁথা হয়। মসজিদে প্রবেশের জন্য রয়েছে ৩টি ধনুক আকৃতির দরজা। ৩টি কারুকার্য খচিত মিহরাব রয়েছে। ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, মোগল আমলের তৎকালীন সম্রাট মোহাম্মদ শাহের অনুরোধে পবিত্র মক্কা শরিফের নাগরিক অন্যতম বুজুর্গ আলেম হযরত মাওলানা শাহ আবু সিদ্দিকী বজরা শাহী মসজিদের প্রথম ইমাম হিসেবে নিয়োজিত হন। তার বংশধররা যোগ্যতা অনুসারে আজও এ মসজিদের ইমামের দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
বর্তমানে প্রথম ইমামের সপ্তম পুরুষ ইমাম মাওলানা হাসান সিদ্দিকী এ মসজিদের ইমামের দায়িত্ব পালন করছেন। স্থানীয় এলাকাবাসীর ধারণায় ঐতিহাসিক বজরা শাহী জামে মসজিদে মানত করলে তাতে শুভ ফল পাওয়া যায়। যার কারণে মনের আশা পূর্ণ করতে, বিপদ থেকে মুক্তিলাভ ও দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায় অসংখ্য নারী ও পুরুষ এ মসজিদে সপ্তাহে প্রতি শুক্রবার শিরনি, জিলাপি, মিষ্টি মানত নিয়ে আসেন। মসজিদটিতে প্রায় শতাধিক মুসল্লি একত্রে নামাজ আদায় করতে পারেন। এছাড়াও বিগত ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে পুরুষদের পাশপাশি দূরদূরান্ত থেকে আগত নারী দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা করেছে মসজিদ কর্র্তৃপক্ষ।
২. সাহেববিবি মসজিদ
(৮০০ বছরের পুরানো ঐতিহ্যবাহী সাহেববিবি মসজিদ)
চট্টগ্রামের রাউজানে এখনো কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ৮০০ বছরের পুরানো ঐতিহ্যবাহী সাহেববিবি মসজিদ। রাউজান পৌরসভার ৯নং ওয়ার্ডের হাঁড়ি মিয়া চৌধুরী বাড়িতে অবস্থিত এ মসজিদ শুধু রাউজানেই নয়, পুরো চট্টগ্রামের একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন ও কালজয়ী নাম। এ মসজিদের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক দারুণ ইতিহাস।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, আরাকান রাজ সভার কবি মহাকবি আলাওলের একমাত্র কন্যা সাহেববিবি (প্রকাশ সাহাবিবি) নামকরণে এই মসজিদ ‘সাহেববিবি মসজিদ’ নামে পরিচিত। সাহেববিবি হলেন রাউজান উপজেলার প্রসিদ্ধ জমিদার হাঁড়িমিয়া চৌধুরী বংশের আমির মোহাম্মদ চৌধুরীর সহধর্মিণী। আমির মোহাম্মদ চৌধুরী-সাহেববিবি দম্পতির দুই কন্যা আলাকা বানু ও মালকা বানু। মালকা বানু বাংলাদেশের এক ঐতিহাসিক কালজয়ী নাম এবং চরিত্র। মালকা বানু নিয়ে দেশে হয়েছে অসংখ্যা নাটক ও ছবি। মালকা বানু চট্টগ্রামের বাঁশখালির জমিদার মনু মিয়ার প্রেমে পড়ে বিয়ে করেন এবং বাঁশখালিতে বসবাস করেন। মালকা বানু আর মনু মিয়াকে নিয়ে হয়েছিল চলচ্চিত্র। সেই ঐতিহাসিক মালকা বানুর মা সাহেববিবির নামে করা সাহেববিবি মসজিদ। যা এখনো কালজয়ী এক স্বাক্ষী হয়ে রয়েছে রাউজানের বুকে। চুন সুড়কির গাঁথুনিতে নির্মাণ করা হয়েছিল দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যশৈলীর সাহেববিবি মসজিদটি। এর পাশে ও সামনে প্রায় ৪ ফুট উঁচু করে নির্মাণ করা হয়েছে গেইট। স্থাপনাটি ৮টি পিলার, ৩টি দরজা, দুটি জানালা ও ১ গম্বুজ বিশিষ্ট। কারুকাজের মাধ্যমে দেয়া হয়েছে শৈল্পিক রূপ। স্থাপত্যের পাশে খনন করা হয়েছে বিশাল দিঘী। ৮’শ বছর পূর্বে নির্মিত স্থাপনাটি রূপগত পরিবর্তন করে বর্তমানে লাগানো হয়েছে টাইলস। এই মসজিদে নামাজ পড়তে দূর-দূরান্ত থেকে অসংখ্যা মুসল্লীরা ছোটে আসেন। কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ঐতিহ্যবাহী দর্শনীয় সাহেববিবি মসজিদ দেখার জন্য দেশের বিভিন্নস্থান থেকে পর্যটকরা ভিড় করেন সময়ে সময়ে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, জমিদার আমির মোহাম্মদ চৌধুরীর পত্নী ও চট্টগ্রামের আলোচিত মালকা বানুর মা সাহেববিবি এই মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা। মসজিদের পাশে রয়েছে ফুলবাগান সম্বলিত কবরস্থান যেখানে শায়িত আছেন এই মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা মরহুমা সাহেববিবি। এছাড়াও এর পাশে আছে সাহেববিবি দীঘি, যাকে শাহী পুকুর নামে পরিচিত। আর মসজিদের পাশে ঈদগাহ মাঠ যা দুই ঈদে এই মাঠে ধর্মপ্রাণ ইসলাম ধর্মের মানুষ’রা নামাজ আদায় করে থাকেন। এই মসজিদ কবরস্থানসহ ৩০শতক জায়গার উপর নির্মিত।
চট্টগ্রাম-রাঙামাটি সড়কের রাউজান বাইন্ন্যাপুকুর এলাকার দক্ষিণ পার্শ্বের একটু অদূরে পৌরসভার ৯নং ওয়ার্ডের হাঁড়ি মিয়া চৌধুরী বাড়িতে অবস্থিত দৃষ্টিনন্দন সাহেববিবি মসজিদটি। ওই স্থানের মানুষের প্রাণের মসজিদ এটি। সঠিক কোন তথ্য না থাকলেও স্থানীয় প্রবীনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ৮’শ বছর পূর্বে মসজিদটি নির্মাণ করেন রাউজান গ্রামের জমিদার আমির মোহাম্মদ চৌধুরীর স্বনামধন্য পত্নী ও চট্টগ্রামের প্রসিদ্ধ মালকা বানুর মা সাহেববিবি। স্থানীয়দের তথ্যমতে, কবরস্থানসহ মসজিদটি ৩০ শতক জমির উপর নির্মিত। বিভিন্ন কারুকাজ সম্বলিত টেরাকোটার ইট ও চুন-সুরকির গাঁথুনিতে মসজিদটি নির্মিত। মসজিদের পূর্ব দেয়ালে তিনটি প্রবেশপথ। পশ্চিম দিকে গম্বুজ থেকেও উঁচু মিম্বর।
আগে দেয়াল মসজিদের বিষয়ে কথা হয় এলাকার অনেক বয়সী কয়েকজন বৃদ্ধালোক দের সাথে, তাঁরা বলেন ছোট বেলায় দাদার মুখে শুনেছিলাম এই মসজিদটি বহু বছর পূর্বে নির্মাণ করা হয়েছিল। আমার দাদাও তার দাদার মুখে শুনেছিল এটি বিদেশী মিস্ত্রী দ্বারা শতশত বছর পূর্বে নির্মাণ করেছে। এই মসজিদে নাকি তখন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মোছাভাত (আঞ্চলিক শব্দ) অর্থাৎ কয়েকদিনের খাবার নিয়ে পাঁয়ে হেটে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসতো নামাজ পড়ার জন্য। বাদশা মুহাম্মদ শাহ স্টেট’র আমলে ডিমের আটা, চুন-সুরকি দিয়ে দেশের ২২টি গ্রামে একই রকম মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছিল। ২২টি মসজিদের মধ্যে প্রথম নির্মাণ করা হয়েছিল সাহেববিবি মসজিদ।’ সাহেববিবি মসজিদটির ভেতরে প্রায় শতাধিক মুসল্লী নামাজ আদায় করতে পারেন। এটি মোতোয়াল্লী তত্ত্বাবধানে গত ৪ বছর আগে রূপগত পরিবর্তন করা হয়।

৩. সুলতান নশরত শাহ মসজিদ
(১৫১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত যা ৫ শতাধিক বছরের প্রাচীণ)
হাটহাজারী উপজেলার বড়দিঘির পশ্চিম পাশে ১৫১৯ সনে সুলতান নশরত শাহ মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। মসজিদের গায়ে সুলতান নশরত শাহ’র মসজিদ নামে নামকরণ করা হয়েছে। পূর্বেকার পিলারসমূহ আস্ত বড় পাথরে খোদাই করা ছিল। ১৯৭০ সনে এটা সম্পূর্ণ ভেঙ্গে নতুন আঙ্গিকে বর্তমানে স্থিত অবস্থায় আনা হয়। এরপর ১৯৮৮ সালে পুনর্নির্মাণের সময় মসজিদের পিলারসমূহ পরিবর্তন করে সিসি ঢালাই করে সাজানো হয়। ৫০৩ বছর আগের দৃষ্টিনন্দন দ্বিতল এই ঐতিহ্যবাহী মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করে থাকেন এক থেকে দেড় হাজার মানুষ। এছাড়া প্রতিদিন এলাকার প্রায় ২ থেকে ৩শত মানুষ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ নামাজ আদায় করে থাকেন।
সুলতান নশরত শাহ’র মসজিদ পরিচালনা কমিটির বর্তমান সহ-সভাপতি এস এম নায়েম আরম এর সাথে কথা বলে জানা যায়, সুলতান নশরত শাহ ১৫১৯-১৫৩২ সন পর্যন্ত রাজত্ব করেন। তিনি ১৫১৯ সনে উত্তর চট্টগ্রামসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামের শঙ্খ তীর অবধি ভূভাগটি জয় করে ফতেয়াবাদ গ্রামে রাজধানী স্থাপন করেন। রাজধানীর নামানুসারে চট্টগ্রামের নতুন নামকরণ করেছিলেন ফতেয়াবাদ। ১৫১৯ সনের পরপরই সুলতান নশরত শাহ এই মসজিদটি নির্মাণ করেন। মসজিদটি তৈরি হয় প্রাচীন পাথরের স্তম্ভ দ্বারা, এছাড়া বড় বড় পাথর এবং যার সাথে পাতলা ইট। ১৯ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ভূমিকম্পের ফলে ফাটল ধরলে লোকজন নামাজ পড়তে যেত না। এভাবে অনেক বছর মসজিদটি পরিত্যক্ত অবস্থায় ঝোপঝাড়ে পরিণত হয়। ২০ শতকের ৩০/৪০ দশকে স্থানীয় কতিপয় লোকের সহায়তায় এটি সংস্কার করা হয়। ১৯৭০ সনে এটা সম্পূন্ন ভেঙ্গে বর্তমান নতুন আঙ্গিকে বর্তমানে স্থিত অবস্থায় আনা হয়। সংস্কারকালে অনেক বড় বড় পাথরের পিলার, পাথর খন্ড, ইট পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে। এক একটা শিলালিপি ছিল অনেকটা চেপ্টা ধরনের গোল। এটার সাথে আরবী হরফে কিছু একটা লেখা ছিল। অনেক চেষ্টা করে শিলালিপি পাঠ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। পাথরটি ১৯৯০ সন থেকে আর পাওয়া যাচ্ছে না। কীভাবে পাথরটি হারিয়ে গেছে সে তথ্য অদ্যাবধি অজ্ঞাত। চট্টগ্রামের পুঁথি সংগ্রাহক মো. ইসহাক চৌধূরী পাথরটি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘরের জন্য সংগ্রহে মসজিদ কমিটির কাছে বার বার ধর্ণা দিয়েও কাজ হয়নি।
পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের জাদুঘরের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কিউরেটর শামসুল হোসাইন কমিটিকে ১০ হাজার টাকা মসজিদের উন্নয়নের জন্য প্রদান করলে মসজিদের পরিত্যক্ত পুরাতন নির্দশন দেন। ঐ সময় কমিটির সভাপতি ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারের ডেপুটি লাইব্রেরিয়ান নুরুল রহমান। মোস্তাফিজুর রহমান কমিটির অন্যতম সদস্য ছিলেন। মসজিদখানার সে পুরাতন শিলালিপি যদি সংগ্রহ করা হতো তবে ইতিহাসের আর এক নবতর অধ্যায়ের সৃষ্টি হতো।
৪. আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ
(১৬৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত)
ইতিহাস আর ঐতিহ্যের এক অন্যতম স্থাপত্য আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ। প্রায় সাড়ে তিনশ বছর আগে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম সদরে নির্মিত এই এ মসজিদটি ঘিরে রয়েছে অসংখ্য ইতিহাস ও মোগল সাম্রাজ্যের অনন্য নিদর্শন।
জানা যায়, ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দের ২৭ জানুয়ারি চট্টগ্রামের তৎকালীন মোগল শাসনকর্তা সুবেদার নবাব শায়েস্তা খাঁর পুত্র উমেদ খাঁ মগ ও পর্তুগিজদের একটি আস্তানার অভ্যন্তরে প্রবেশ করলে এর নামকরণ করা হয় ‘আন্দরকিল্লা’।
যুদ্ধ বিজয়ের স্মারক হিসেবে দিল্লির সম্রাট আওরঙ্গজেব চট্টগ্রামের নতুন নামকরণ করেন ইসলামাবাদ। তারই নির্দেশে চট্টগ্রাম বিজয়ের মোগল স্মারক চিহ্ন হিসেবে শায়েস্তা খাঁ ১৬৬৭ সালে ‘আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ’ নির্মাণ করেন। দিল্লি’র এক ঐতিহাসিক জামে মসজিদের অবয়বে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়।
সমতল ভূমি থেকে প্রায় ত্রিশ ফুট ওপরে ছোট্ট পাহাড়ের ওপর মসজিদটির অবস্থান। মূল মসজিদের নকশা অনুযায়ী, আন্দরকিল্লা শাহী মসজিদ ১৮ গজ (১৬ মিটার) দীর্ঘ, ৭ দশমিক ৫ গজ প্রস্থ। প্রতিটি দেয়াল প্রায় ২ দশমিক ৫ গজ পুরু। পশ্চিমের দেয়াল পোড়া মাটি এবং বাকি তিনটি দেয়াল পাথর দিয়ে তৈরি। মধ্যস্থলে একটি বড় এবং দুটি ছোট গম্বুজ দ্বারা ছাদ আবৃত। ১৬৬৬ সালে নির্মিত মসজিদের চারটি অষ্টভুজাকৃতির গম্বুজগুলোর মধ্যে পেছন দিকের দুটি এখনো বিদ্যমান রয়েছে। মসজিদটির পূর্বে তিনটি, উত্তর এবং দক্ষিণে একটি করে মোট ৫টি প্রবেশদ্বার রয়েছে। মসজিদটিতে তিনটি মেহরাব থাকলেও সাধারণত মাঝের সর্ববৃহৎ মেহরাবটিই বর্তমানে ব্যবহৃত হচ্ছে।
আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ নির্মাণের প্রায় ৫৬ বছর পর অর্থাৎ ১৭২৩ খ্রিস্টাব্দে আরেক শাসনকর্তা নবাব ইয়াসিন খাঁ মসজিদের সন্নিকটের পাদদেশের দক্ষিণ-পূর্ব দিকের একটি টিলার ওপর আরেকটি পাকা মসজিদ নির্মাণ করেন। যার নামকরণ করা হয় ‘কদম রসুল’। এক সময় আন্দরকিল্লা মসজিদের চেয়ে কদম রসুল মসজিদটি বেশ জনপ্রিয়তা পেতে থাকে। যার কারণে আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ মুসল্লিদের গ্রহণযোগ্যতা হারায়। এক পর্যায়ে মসজিদটি লোকশূন্য হয়ে পড়লে এ সুযোগটি কাজে লাগিয়ে ১৭৬১ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদটিকে তাদের গোলাবারুদ রাখার গুদাম হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে। ১৮৮৫ সালে নবাব হামিদুল্লাহ খাঁর বিশেষ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মসজিদটি ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের জন্য পুনরায় উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। এরপর ১৬৬৭ সাল থেকে এ মসজিদ ঘিরে চট্টগ্রামের ইসলামি ধর্মাবলম্বীদের ব্যাপক আনাগোনা শুরু হয়। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই মহানবীর বংশধররা (আওলাদে রাসুলরা) এ মসজিদের খতিব হিসেবে নিযুক্ত হতেন। যার ধারাবাহিকতা এখনো রয়েছে। বর্তমানে এ মসজিদটির খতিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন আওলাদে রাসুল সাইয়্যেদ আনোয়ার হোসাইন তাহের জাবেরি আল মাদানি এবং নিয়মিত ইমামতি করছেন ৩ জন ইমাম, ২ জন মুয়াজ্জিন ও ৭ জন খাদেম।
মসজিদটির সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মসজিদে প্রতিদিন অন্তত ৪ হাজার মুসল্লি নিয়মিত নামাজ আদায় করতে পারার ধারণ ক্ষমতা রয়েছে। মসজিদে প্রতি শুক্রবার একত্রে গড়ে ৮ থেকে ৯ হাজার মানুষ নামাজ আদায় করেন। পবিত্র রমজান মাসের জুমআতুল বিদায় ২০ থেকে ২৩ হাজার মানুষের বিশাল জামাত অনুষ্ঠিত হওয়ার নজিরও রয়েছে।
প্রতি বছর পবিত্র মাহে রমজানের প্রথম রোজা থেকে শেষ রোজা পর্যন্ত এই মসজিদে নগরের বিত্তবান শিল্পপতিদের অনুদানে ২ থেকে ৩ হাজার মানুষের জন্য বিশাল ইফতারের আয়োজন করা হয়। ইফতার আয়োজনে অংশ নিতে বিভিন্ন গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ছুটে আসেন শত শত মানুষ।  রমজানে মসজিদের আরও একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, মুসলমান রোজাদার ব্যক্তিরা ছাড়াও হিন্দু ধর্মাবলম্বীর মানুষরাও ইফতারে শরিক হন। তাদের মতে, এই মসজিদে ইফতার গ্রহণ করলে সুফল লাভ করা যায়। প্রায় ১ দশক আগে শুরু হওয়া মসজিদের বিশাল এ ইফতার আয়োজনে আর্থিকভাবে যারা সহযোগিতা করেন তাদের বেশিরভাগই চট্টগ্রামের শিল্পপতি। তবে তাদের অনুরোধেই এত বড় আয়োজনে তাদের নাম প্রকাশ করা হয় না।
৫. চন্দনপুরা হামিদিয়া তাজ মসজিদ
(১৬৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত)
বাংলাদেশের ঐতিহাসিক স্থাপত্যশৈলীর অন্যতম নিদর্শন বন্দরনগরী চট্টগ্রামের চন্দনপুরা হামিদিয়া তাজ মসজিদ। চোখ ধাঁধানো কারুকাজে নির্মিত সুসজ্জিত এ মসজিদটি আকর্ষণ কেড়ে নেয় সবার।
ইতিহাস মতে, ১৬৬৬ সালে নবাব শায়েস্তা খানের সেনাদল আরাকান মগ রাজাদের কবল থেকে চট্টগ্রামকে স্বাধীন করার পর সেখানে মোগল শাসন কায়েম করেন। তখন থেকেই শাহী ফরমানের অঞ্চলে অনেকগুলো মসজিদ নির্মাণ করা হয় এই নগরে। এছাড়াও ইসলামি নগরখ্যাত চট্টগ্রামে মোগল সাম্রাজ্যের ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে রয়েছে একাধিক মসজিদ। এর মধ্যে আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ, অলি খাঁ জামে মসজিদ অন্যতম। ইতিহাসনন্দিত সেই মসজিদগুলো আজও স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে আছে।
চট্টগ্রাম নগরীর চকবাজার ওয়ার্ডে অবস্থিত দৃষ্টিনন্দন চন্দনপুরা হামিদিয়া তাজ মসজিদ ঘিরে রয়েছে অসংখ্য মানুষের আনাগোনা। শুধু নগরবাসীই এই মসজিদে আসেন এমন নয়, এই মসজিদটি এক নজর দেখতে ছুটে আসেন দেশি-বিদেশি পর্যটকরাও। চন্দনপুরা মসজিদে আছে ১৫টি গম্বুজ। এর মধ্যে বড় গম্বুজটির নির্মাণ সামগ্রী আনা হয়েছিল ভারতবর্ষ থেকে। সেই সময়ের প্রায় ৪ লাখ টাকার ১৫ মণ রুপা ও পিতল ব্যবহার করা হয় গম্বুজটি নির্মাণে। গম্বুজের চারপাশে লেখা রয়েছে শিলালিপিতে আহলে বায়তে রাসুলসহ দুনিয়ায় জান্নাতের সুসংবাদ পাওয়া ১০ সাহাবির নাম। মসজিদটির সুউচ্চ মিনার থেকে শুরু করে দেয়াল, উঁচু পিলার, দরজা ও জানালা সব কিছুতেই দারুণ কারুকাজ দৃশ্যমান।
ইতিহাসে উল্লেখ আছে, ১৬৬৬ সালে মসজিদটির ভিত্তিপ্রস্তর করা হয়। ১৯৫০ সালে এর পূর্ণ সংস্করণের কাজ সম্পন্ন করা হয়। প্রথম পর্যায়ে মাস্টার আবদুল হামিদ নামে এক ধনাঢ্য ব্যক্তি মসজিদটির সংস্কারের উদ্যোগ নেন। পরে তার মৃত্যুর পর মাস্টার আব্দুল হামিদের জ্যেষ্ঠ পুত্র আবু সাইয়্যিদ দোভাষ ১৯৪৬ সালে এটির সংস্কার ও পুনর্নির্মাণের কাজ শুরু করেন। মসজিদটির পরিচিতি বৃদ্ধি পেতে সহায়তা করেছে ‘এশিয়া ট্রাভেল ট্যুরস’ নামের একটি জনপ্রিয় ম্যাগাজিন। তারা তাদের প্রচ্ছদে এই মসজিদের ছবি ব্যবহার করলে বিশ্ববাসী ঐতিহাসিক এই মসজিদ সম্পর্কে জানতে পারে। চট্টগ্রামের আইকনিক চিত্র কিংবা ডকুমেন্টোরিগুলোতে এই মসজিদটির স্থান শীর্ষে। ষাটোর্ধ্ব এক মুসল্লি জানান, প্রথমদিকে বহু বছর মসজিদটিতে মাইকের ব্যবহার না থাকায় মোয়াজ্জিনরা ৪ তলা সমান উঁচু মিনারে উঠে উচ্চস্বরে আজান দিতেন।  দোতলা মসজিদটিতে একত্রে নামাজ আদায় করতে পারেন অন্তত ৩ হাজার মুসল্লি। মসজিদে নিয়মিত ইমামতি করছেন ২ জন ইমাম, ১ জন খতিব ও ৩ জন মুয়াজ্জিন। এছাড়াও ঐতিহাসিক সংরক্ষিত বিভিন্ন দুর্লভ জিনিসের পাহারায় নিয়োজিত থাকেন পর্যাপ্ত পরিমাণ নৈশপ্রহরী।

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on pinterest
Pinterest
Share on reddit
Reddit

Discussion about this post

এই সম্পর্কীত আরও সংবাদ পড়ুন

আজকের সর্বশেষ

ফেসবুকে আমরা

সংবাদ আর্কাইভ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০